বইয়ের নামঃ আগুন পাখি
লেখকঃ হাসান আজিজুল হক
আমি এই লেখনীর নাম দিলাম "ললনা কথন"। কারণ এক ললনার বর্ণিত কথাই এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে এই নারীই বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের মা।
কথাসাহিত্য যে আঞ্চলিক ভাষার দ্বারা কত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় সেটাই দেখিয়েছেন হাসান আজিজুল হক। বলছিলাম, হাসান আজিজুল হকের "আগুন পাখি" উপন্যাসের কথা।
একটা মেয়ে বউ হয়ে শ্বশুর বাড়ী আসার পর থেকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, সবাইকে আপন করে নেওয়া, সংসারের নানা টানাপোড়নে শক্ত করে হালটি ধরা, আবার নিজের হাতে গড়ে তোলা সোনার সংসারটি চোখের সামনে ভেঙ্গে যেতে দেখা, এমন সব ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে দেখা যায় একজন নারীকে এই উপন্যাসে।
মেয়ে' অর্থ মানিয়ে নেওয়া, আগুন পাখি' পড়ে শিখেছি। কিন্তু সেই মেয়েরও যে একটা নিজস্ব সত্ত্বা আছে সেই পরিচয় দিতেও ভুল করেননি বিশিষ্ট গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। স্বামীর বাধ্যগত স্ত্রী, যে কিনা কোনদিন স্বামীর মুখের উপর একটি রা-কথা বলেনি, নিজের সত্ত্বাকে বাঁচানোর জন্য সে-ও স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দোলাচলে তার স্বামী,সন্তান যখন ভিনদেশি হওয়ার পথে,তখন তাকে দেশ ছেড়ে ভিনদেশি হওয়ার কথা বললে সে বলে, "চারাগাছ এক জায়গা থেকে আর দ্যাশে লাগাইলেও বোধায় হয়, কিন্তুক গাছ বুড়িয়ে গেলে আর কিছুতেই ভিন্ মাটিতে বাঁচে না।"
সারাজীবন স্বামীর কথা শুনে আসা মানুষটি হঠাৎ করে কেনই বা তার কথা অমান্য করলেন সে বিষয়টিও বিস্ময়ের,
" আমি আর আমার সোয়ামি তো এক মানুষ লয়,
আলেদা মানুষ। খুবই আপণ মানুষ, জানের মানুষ, কিন্তুক আলেদা মানুষ।"
সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীদেরকে তুচ্ছ মনে করা হতো। তাদের নিয়ে আমার লেখা চারটি লাইন আছে-
"ওহে পুরুষ, কি ভাবো মেয়েদের?
খেলার পুতুল, কলের গাড়ী,
যেমন ইচ্ছে নাড়াতে পারি?
ইচ্ছে হলে দিলেম ছাড়ি,
কষ্ট হলে বইতে নারি?
তখনকার সমাজ মেয়েদের মূল্য দিতে পারেনি এটি সুস্পষ্ট! বউ মরলে স্বামী কাঁদবে? ছিঃ ছিঃ! এ বড় লজ্জার কথা!
এটা তো গেল সামাজিক পটভূমি। এখানে আরো বর্ণিত ছিল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। ছিল ব্রিটিশ আমলেন শাসন, তেতাল্লিশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের করুণ পরিনতি, সাতচল্লিশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অখন্ড বাংলার দ্বিখন্ড হওয়ার ইতিহাস। যদিও এটি কোনো ইতিহাস নয়, উপন্যাসই বটে। কিন্তু তা ক্রমে ক্রমে আমাদের ইতিহাসের সামনে এনে দাঁড় করায়। জিন্নাহ, হাশিম আলি, গান্ধী, নেহেরু,প্রনব মুখার্জি, এ কে ফজলুল হক প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।উপন্যাসের শুরুটা হয়েছিল একটা পরিবার দিয়ে, আর সেটা ক্রমে ক্রমে একটা থেকে দুটো, তিনটে, চারটে মিলে সমাজ, তারপর ধর্মনীতি এবং রাজনীতির মধ্য দিয়ে শেষ করা হয়েছে।
বেশি না, বড়জোর ২২৪ পৃষ্ঠা, কিন্তু এই ২২৪ পৃষ্ঠার বর্ণনায় যা ছিল, তা পরিপূর্ণ করতে পৃথিবীর অন্যান্য কথাসাহিত্যকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে!
0 Comments